কেন ওয়ানডেতে ফেরার প্রস্তাবে রাজি হননি মুশফিক বিস্তারিত



বাংলাদেশ ক্রিকেটের অন্যতম অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম আবারও ওয়ানডে ক্রিকেটে ফেরার প্রস্তাব পেয়েছিলেন। তবে জাতীয় দলের প্রয়োজনে দীর্ঘদিন খেলার পর এবার তিনি নিজের সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছেন। সম্প্রতি সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন কেন তিনি আর ওয়ানডে ক্রিকেটে ফিরতে চান না।

গত বছর চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়ানডে ক্রিকেটকে বিদায় জানান মুশফিকুর রহিম। এরও আগে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে দেশের হয়ে শুধুমাত্র টেস্ট ক্রিকেট খেলছেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি হলেও এখনো ফিটনেস এবং পারফরম্যান্সে তিনি অনেক তরুণ ক্রিকেটারের চেয়ে এগিয়ে আছেন।

বাংলাদেশ দলের মিডল অর্ডার গত কয়েকটি সিরিজে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভালো করতে পারেনি। টানা কয়েকটি ওয়ানডে সিরিজ হারার পর অভিজ্ঞ কাউকে দলে ফেরানোর চিন্তা থেকেই মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় দলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তিনি সেই প্রস্তাবে সাড়া দেননি।

মুশফিক বলেন, বাংলাদেশ দল এখন এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, তরুণ ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জায়গা করে দিতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দল আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং তাঁর ব্যক্তিগত সার্ভিস ছাড়া দল এগিয়ে যেতে পারবে।

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে অসাধারণ অবদান রেখেছেন মুশফিকুর রহিম। দেশের জার্সিতে ২৭৪টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে প্রায় আট হাজার রান করেছেন তিনি। রয়েছে একাধিক স্মরণীয় ইনিংস এবং গুরুত্বপূর্ণ জয়। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সফল মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবেই বিবেচনা করা হয় তাঁকে।

তবে এখন আর রঙিন পোশাকের ক্রিকেটে ফেরার পরিকল্পনা নেই তাঁর। তিনি জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার কারণে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ খুব কম পেয়েছেন। বর্তমানে কিছুটা স্বাভাবিক জীবন উপভোগ করতে পারছেন বলেই খুশি তিনি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এখন তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

টেস্ট ক্রিকেটে এখনো নিজের সেরাটা দিয়ে যাচ্ছেন মুশফিক। সম্প্রতি মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ম্যাচে দুই ইনিংসে গুরুত্বপূর্ণ রান করে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে দায়িত্ব নেওয়ার অভ্যাস এখনো বদলায়নি তাঁর।

বাংলাদেশের টেস্ট দলের বর্তমান অবস্থান নিয়েও আশাবাদী এই অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। তাঁর মতে, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখনকার দল বেশি ধারাবাহিক এবং আত্মবিশ্বাসী। আগের মতো বছরে মাত্র দুই বা তিনটি টেস্ট নয়, এখন বাংলাদেশ নিয়মিত টেস্ট খেলছে। ফলে ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা এবং আত্মবিশ্বাস দুটোই বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান দলে অনেক বেশি পারফরমার রয়েছে। আগে হয়তো দু-একজন ক্রিকেটারের ওপর নির্ভর করতে হতো, কিন্তু এখন দলে পাঁচ থেকে আটজন ক্রিকেটার নিয়মিত অবদান রাখছে। যেকোনো সফল দলের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

মুশফিকুর রহিম বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০ টেস্ট ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেছেন। প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি দেখেছেন অনেক সাফল্য, ব্যর্থতা এবং কঠিন সময়। দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নের পুরো যাত্রারই একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন তিনি।

অধিনায়ক হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন মুশফিক। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে। দলের কঠিন সময়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবসময়ই প্রশংসিত হয়েছেন তিনি।

ভবিষ্যতে আর কতদিন ক্রিকেট খেলবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে মুশফিক খুব বাস্তবসম্মত উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্রিকেটে ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। আগামী ম্যাচই হয়তো শেষ ম্যাচ হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করে এগোচ্ছেন না তিনি। যতদিন শরীর এবং মন সাপোর্ট দেবে, ততদিন দেশের হয়ে খেলতে চান।

মুশফিকের ভাষায়, ভালো সময় থাকতেই বিদায় নিতে চান তিনি। নিজের পারফরম্যান্স যখন দলের জন্য কার্যকর থাকবে, তখনই মাঠে থাকতে চান। তবে কখন অবসর নেবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

বাংলাদেশ দল বর্তমানে টেস্ট ক্রিকেটে দারুণ সময় পার করছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচ জয়ের পর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে দলের। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টেও জয় পেয়ে সিরিজ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে স্বাগতিকরা।

এই সিরিজে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের পাশাপাশি তরুণদের পারফরম্যান্সও নজর কাড়ছে। দল হিসেবে বাংলাদেশের উন্নতির পেছনে সিনিয়র ক্রিকেটারদের অবদান যেমন রয়েছে, তেমনি নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসও বড় ভূমিকা রাখছে।

মুশফিকুর রহিমের সিদ্ধান্ত হয়তো অনেক ভক্তকে হতাশ করেছে, কারণ এখনো তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে তিনি যে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন, সেটি পরিষ্কার। একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে নতুনদের সুযোগ করে দেওয়ার মানসিকতা তাঁর ব্যক্তিত্বকেই আরও বড় করে তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে মুশফিকুর রহিমের অবদান সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ালেও টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর অভিজ্ঞতা এখনো দলের জন্য বড় শক্তি। মাঠে তাঁর লড়াকু মানসিকতা এবং দায়িত্বশীল ব্যাটিং তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবেই কাজ করছে।

আগামী দিনগুলোতে হয়তো তাঁকে আর ওয়ানডে জার্সিতে দেখা যাবে না, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর নাম সবসময়ই সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান কখনো ভোলার নয়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url